জন-আকাঙ্ক্ষার নির্বাচন ও আগামী দিনের বাংলাদেশ

1767981259-0bcdaeb32ceb412bb862b48712a4f0f0.jpg

ডেস্ক রিপোর্ট:  আমাদের প্রজন্মের জন্য ‘ভোট’ শব্দটি গত এক দশকে অনেকটা পাঠ্যবইয়ের সংজ্ঞার মতোই তাত্ত্বিক রয়ে গেছে। কিন্তু ২০২৪-২৫ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে, রাষ্ট্র শুধু নীতিনির্ধারকদের নয়, রাষ্ট্র আসলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের। সেই উত্তাল দিনগুলোর পর আসন্ন নির্বাচন আমাদের সামনে শুধু সরকার পরিবর্তনের সুযোগ নয়, বরং রাষ্ট্রকে ‘রিসেট’ করার একটি ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। একজন শিক্ষার্থী ও তরুণ ভোটার হিসেবে এই নির্বাচন ঘিরে আমাদের প্রত্যাশা আর সমীকরণগুলো চিরাচরিত রাজনীতির চেয়ে কিছুটা ভিন্ন।

১.
সংখ্যাতত্ত্ব বনাম গুণগত মান : আমরা এমন একটি নির্বাচন চাই না, যেখানে ভোটার উপস্থিতি শুধু কাগজ-কলমের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকবে। আমাদের প্রত্যাশা একটি ‘স্মার্ট ভোটিং কালচার’।ভয়হীনভাবে ভোট দিতে আসা : নতুন যাঁরা প্রথমবার ভোট দেবেন, তাঁদের জন্য কেন্দ্র যেন কোনো ভীতিকর জায়গা না হয়। আমরা এমন একটি পরিবেশ চাই, যেখানে আমাদের প্রথম ভোটটি হবে একটি উৎসবমুখর পরিবেশে।

আদর্শিক বিতর্ক : আমরা প্রার্থীর পেশিশক্তি বা অর্থনৈতিক অবস্থা দেখতে চাই না; বরং প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীদের মধ্যে প্রকাশ্য বিতর্ক দেখতে চাই,  যেখানে তাঁরা দেশ ও উন্নয়ন নিয়ে তাঁদের পরিকল্পনা তুলে ধরবেন।

২.

নির্বাচিত সরকারের কাছে ‘জেনারেশন জেড’-এর    চাওয়া : নতুন সরকারের কাছে আমাদের দাবিগুলো শুধু রাস্তাঘাট বা অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আমরা চাই এমন এক সিস্টেম, যা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিতে সক্ষম।

গিগ ইকোনমি ও ডিজিটাল সুরক্ষাকবচ : দেশের বিশাল এক তরুণ জনগোষ্ঠী এখন ফ্রিল্যান্সিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন বা অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আমরা এমন এক রাষ্ট্র চাই, যেখানে পেপাল (চধুচধষ) বা আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়েগুলো কোনো বাধা ছাড়াই কাজ করবে এবং ডিজিটাল উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা থাকবে।

শিক্ষায় ‘স্কিল বেইসড’ ট্রান্সফর্মেশন : শুধু সনাতন সার্টিফিকেটের বোঝা নয়, আমরা চাই বর্তমান বাজার চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কারিগরি শিক্ষা। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ব্লক চেইন ও ডেটা সায়েন্সের মতো বিষয়গুলোকে জাতীয় শিক্ষাক্রমের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

মেন্টাল হেলথ ও সোশ্যাল সেফটি : জেনারেশন জেড মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব বোঝে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে পেশাদার কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করা এবং তরুণদের ওপর সামাজিক ও পারিবারিক চাপ কমাতে রাষ্ট্রীয় প্রচার চালানো এখন সময়ের দাবি।

ক্লাইমেট জাস্টিস : আমরাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ভুগব।

তাই নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া—নগর পরিকল্পনায় কংক্রিটের চেয়ে সবুজকে প্রাধান্য দেওয়া, জলাশয় রক্ষা করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বৈপ্লবিক বিনিয়োগ।

ভোটের পর জবাবদিহি : আমরা শুধু ভোটের দিন গুরুত্বপূর্ণ হতে চাই না। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যদি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন, তাহলে মেয়াদের মাঝপথেও যেন নাগরিকরা তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে—এমন কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা আইনি কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।

লিঙ্গবৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ : লিঙ্গ, ধর্ম বা বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি নিরাপদ রাষ্ট্র চাই। বিশেষ করে নারীদের জন্য নিরাপদ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের অন্যতম প্রধান দাবি।

৩.

যে কঠিন পাহাড় ডিঙাতে হবে : ক্ষমতায় আসা সহজ হলেও রাষ্ট্র পরিচালনা করা যে কঠিন, তা আমরা বুঝি। নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে—

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ধারাবাহিকতা : গত কয়েক মাসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যে সংস্কারের হাওয়া লেগেছে, নির্বাচনের পর তা যেন স্থবির হয়ে না যায়। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিভিল সার্ভিস গঠন করা হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মস্তিষ্ক পাচার (ইত্ধরহ উত্ধরহ) রোধ : দেশের মেধাবী তরুণরা কেন বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে? এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করা এবং দেশে স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা নতুন সরকারের জন্য একটি এসিড টেস্ট।

উগ্রবাদ ও অসহিষ্ণুতা দমন : রাজনৈতিক বা ধর্মীয় চরমপন্থা যেন নতুন বাংলাদেশের বৈচিত্র্য নষ্ট না করে, তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

৪.

শেষকথা চেক অ্যান্ড ব্যালান্স : আমরা এমন সরকার চাই না, যারা ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের অজেয় মনে করবে। নতুন প্রজন্মের ভোটার হিসেবে আমরা প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করব। আমাদের কাছে গণতন্ত্র মানে শুধু পাঁচ বছরে এক দিন ভোট দেওয়া নয়; বরং পরবর্তী পাঁচ বছর সরকারকে প্রশ্ন করার অধিকার। আসন্ন নির্বাচন হোক সেই পথচলার শুরু, যেখানে রাষ্ট্রের মালিকানা কোনো বিশেষ দলের হাতে নয়, বরং ফিরে আসবে জনগণের হাতে। আমরা একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে অপেক্ষায় আছি।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top