কোনো দেশ চাইলেই কি অন্য দেশের প্রধানকে আটক করতে পারে?

1767457711-e98c0b58fa578618d7fca39ee4c5596d.jpg

৩ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় হামলা ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক আটকের দাবির পর লন্ডনে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের বাইরে প্রতিবাদকারীরা। ছবি : রয়টার্স

ডেস্ক রিপোর্টঃ   ভেনেজুয়েলায় শনিবার আকস্মিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা দাবি করছে, এ হামলা চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক ‘গ্রেপ্তার’ করেছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, নিউইয়র্কে একাধিক অভিযোগে অভিযুক্ত মাদুরো। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, মাদুরোকে সেখানে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

তবে এতে কিছু প্রশ্নের উদ্রেক ঘটে, অভিযোগের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বা কোনো দেশ চাইলেই কি অন্য দেশে হামলা চালাতে পারে বা সেই দেশের প্রধানকে আটক, গ্রেপ্তার বা তুলে নিতে পারে?

চলুন খুঁজে দেখা যাক এই প্রশ্নের উত্তর।

কোনো দেশ কি হামলা চালিয়ে অন্য দেশের ভূখণ্ডে ঢুকতে পারে

এক কথায় উত্তর দিতে গেলে এ প্রশ্নের উত্তর হবে, না। তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও আছে।

আন্তর্জাতিক আইনের মূল ভিত্তিই হলো কোনো দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করা যাবে না।

জাতিসংঘের সনদের অনুচ্ছেদ ২(৪) অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা হামলার হুমকি দিতে পারে না।
তবে এখানে দুটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে। যদি বিশেষ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি থাকে তাহলে নির্দিষ্ট দেশে হামলা চালানোর বৈধতা আছে। এ ছাড়া জাতিসংঘ চার্টারের ৫১ নাম্বার ধারা অনুসারে, কোনো দেশের তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষার প্রয়োজন হলে, সেক্ষেত্রে জাতিসংঘ অনুচ্ছেদ ২(৪) এর ব্যতিক্রম ঘটবে।

অন্য দেশের প্রধানকে ‘তুলে নেওয়া’

আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইন অনুসারে, যেকোনো রাষ্ট্রের একজন বর্তমান প্রধান অন্য দেশের আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিগত দায়মুক্তি ভোগ করেন।

আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত (আইসিজে) ২০০২ সালের একটি আলোচিত রায়ে পরিষ্কার করেছে, পদে থাকাকালীন একজন রাষ্ট্রপ্রধান বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অন্য কোনো দেশের আদালতে মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা যাবে না, এমনকি যদি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ বা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগও থেকে থাকে।

মামলা থাকলে গ্রেপ্তারের বৈধ উপায় কী

এ ক্ষেত্রে মূলত দুইটি উপায় রয়েছে।

প্রথমত, দুই দেশের মধ্যে চুক্তি থাকলে আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে হস্তান্তরের অনুরোধ করা যায়। তবে রাষ্ট্রপ্রধানরা সাধারণত এর বাইরে থাকেন।

দ্বিতীয়ত, সেই রাষ্ট্র রোম স্ট্যাটিউটের সদস্য হয়ে থাকলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারে। তবে এক্ষেত্রেও অন্য দেশ সরাসরি হামলা চালিয়ে তাকে তুলে নিতে পারে না। বরং সদস্য দেশগুলোকে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য সহযোগিতা করতে হয়।

স্বার্থরক্ষা বা ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অজুহাত

সাম্প্রতিক উদাহরণে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, ভেনেজুয়েলায় হামলা মূলত মার্কিন স্বার্থ রক্ষার্থে। তাদের অভিযোগ ভেনেজুয়েলা থেকে মাদক যুক্তরাষ্ট্রে পাচার হওয়ার মাধ্যমে বহু মার্কিন নাগরিক মৃত্যুবরণ করছে। এই অজুহাতে তারা তাদের অভিযানকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা সাধারণত মনে করেন, অপরাধমূলক অভিযোগের ভিত্তিতে একটি সার্বভৌম দেশে সামরিক হামলা চালিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নেওয়া জাতিসংঘের সনদের পরিপন্থী। এটি ‘আইন প্রয়োগ’ নয়, বরং এটি একটি ‘যুদ্ধংদেহী পদক্ষেপ’।

আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক, গুরুতর ও চলমান হামলার হুমকি থাকতে হবে। হামলা বা আটকের পদক্ষেপটি অনুপাতিক ও প্রয়োজনীয় হতে হবে।

যদিও রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ সাধারণত এই মানদণ্ডের আওতায় পড়ে না।

বাস্তবতা

কাগজে-কলমে তাত্ত্বিকভাবে এ ধরনের কাজকে অবৈধ বলা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো এ ধরনের কাজ করে থাকে। তবে কোনো রাষ্ট্র এসব কাজ করলেই তা আইনসিদ্ধ হয়ে যায় না।

আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে, এক দেশ অন্য দেশে হামলা চালিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নিয়ে যেতে পারে না। এটি জাতিসংঘ সনদ, সার্বভৌমত্বের নীতি এবং রাষ্ট্রপ্রধানের দায়মুক্তি—এই তিনটি প্রধান আইনি স্তম্ভের সরাসরি লঙ্ঘন।

কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তা সমাধানের জন্য কূটনৈতিক বা আন্তর্জাতিক আদালতের পথ অনুসরণ করতে হয়। সামরিক হামলা এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top