বাকি ছিল শুধু শপথ গ্রহণ—শেষ মুহূর্তে ভেঙে গেল মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার স্বপ্ন

1765785624-794cdb9c73f8c687c66ee249c67e263a.jpg

ছবিসূত্র : রয়টার্স

ডেস্ক রিপোর্টঃ এক দশকেরও বেশি সময় আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসা ইরানি অভিবাসী সানাম অবশেষে মার্কিন নাগরিক হতে চলেছেন। বছরের পর বছর ধরে কাগজপত্র, অনুমোদন, পরীক্ষা এবং নিরাপত্তা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ তাকে শেষ ধাপে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তারপর গত ৩ ডিসেম্বর নাগরিকত্ব অনুষ্ঠানে শপথ গ্রহণের মাত্র দুই দিন আগে মার্কিন সরকার হঠাৎ করে তা বাতিল করে দেয়।

সানাম প্রথমে হতবাক এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন, এর কোনো ব্যাখ্যা ছিল না।

তিনি বিবিসিকে বলেন, কোনো ভুল না করেও কেন অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছিল, তা তিনি বুঝতে পারেননি। পরে অবশ্য তিনি জানতে পারেন, সমস্যা তার জন্মস্থান। এ কারণে তিনি দুঃখ এবং হতাশায় ভুগছেন।

সানাম বলেন, ‘কয়েক বছর কেটে গেছে, এখন কেবল ক্লান্ত বোধ হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমি কি এই প্রক্রিয়াটি চালিয়ে যেতে পারব? কারণ এটি খুব কঠিন। এটি সত্যিই হৃদয়বিদারক।’

নিজের আসল নাম প্রকাশ করতে চান না সানাম। তবে তিনি তার ডাকনাম জানিয়েছে।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যে স্বামীর সঙ্গে থাকেন। তার স্বামী কানসাসের একজন মার্কিন নাগরিক। বিবিসি সানামের পরিচয় যাচাই করেছে। সানামের মতো ঘটনা একটি নয়। চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানসহ ১৯টি দেশের অভিবাসীদের নাগরিকত্ব নেওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান বাতিল করা শুরু করে।

এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ফলে সানামের মতো অনেক বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা বড় অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছেন। তারা ইতিমধ্যে মার্কিন নাগরিক হওয়ার সব ধাপ শেষ করেছিলেন, শুধু শেষ আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু এখন তারা জানেন না, ভবিষ্যতে কী হবে।

সানাম বলেন, ‘আমাদের জীবন যেন এখন ঝুলে আছে।’ তিনি ও তার স্বামী মনে করেন, তারা পুরোপুরি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এই অভিজ্ঞতার পর সানাম ভাবতে শুরু করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আদৌ ঠিক হবে কি না। ইরানে তার পরিবার রয়েছে, বৃদ্ধ বাবা-মাও সেখানে থাকেন। তিনি জানেন না, আবার কবে তাদের দেখতে পারবেন।

তিনি বলেন, ‘এখন আশার কথা ভাবাই কঠিন। সময়টা সত্যিই ভয়ের।’ সামনে ছুটির মৌসুম আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই সময়টা তো আনন্দের হওয়ার কথা, পরিবারের সঙ্গে থাকার কথা। কিন্তু এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে মানুষ যাচ্ছে—এটা খুবই কষ্টের।’

ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার শিকার ১৯টি দেশ

শপথ অনুষ্ঠান বাতিল করা ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নিয়ম কঠোর করার সর্বশেষ প্রচেষ্টার একটি অংশ মাত্র। ইতিমধ্যেই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ১৯টি দেশের অভিবাসীদের অভিবাসন প্রক্রিয়া যেখানেই থাকুক না কেন, বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কেবল চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকা অভিবাসীদের ক্ষেত্রেই নয়।

এই পদক্ষেপ এবং এর মতো অন্যান্য পদক্ষেপগুরো ২৬ নভেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের ওপর একজন আফগান নাগরিকের গুলিবর্ষণের পরে নেওয়া হয়েছিল। ওই হামলায় একজন নিহত এবং একজন গুরুতর আহত হন।

ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন কঠোর করার পক্ষে যুক্তি হিসেবে একটি গুলিবর্ষণের ঘটনাকে ব্যবহার করেছে। এর অংশ হিসেবে তারা বেশ কয়েকটি নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—ওয়াশিংটন ডিসিতে অতিরিক্ত ৫০০ জন ন্যাশনাল গার্ড সেনা মোতায়েন, কর্মভিত্তিক ভিসার মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে ১৮ মাসে নামিয়ে আনা এবং সব ধরনের আশ্রয় আবেদনের ওপর সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা।

মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা, আমেরিকানদের জীবন রক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই বিধিনিষেধগুলো প্রয়োজনীয়। শত শত অভিবাসী অধিকার গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী একটি অলাভজনক সংস্থা নিউ ইয়র্ক ইমিগ্রেশন কোয়ালিশনের নীতি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট মারিও ব্রুজোন বলেন, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো অভিবাসীদের বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ফেলেছে, তাদের সুরক্ষার প্রয়োজন।

তিনি আরো বলেন, ‘অনির্দিষ্টকালের বিরতি হলো একটি নিষেধাজ্ঞা। তারা ডিসিতে সাম্প্রতিক গুলিবর্ষণের ঘটনাকে আক্রমণ বৃদ্ধির অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে অভিবাসী এবং শরণার্থীদের বিরুদ্ধে।’

ভেনেজুয়েলার একজন অভিবাসী জর্জও মার্কিন নাগরিক হওয়ার পথে ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে ২ ডিসেম্বর তার অনুষ্ঠানের ২৪ ঘন্টারও কম সময় আগে তাকে বলা হয়েছিল, অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে এবং কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

জর্জ বলেন, ‘আমি সবকিছু প্রস্তুত করেছিলাম। আগের দিন কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই এটি বাতিল করা হয় এবং আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কেও কোনো স্পষ্টতা দেওয়া হয়নি।’ জর্জ তার আসল নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন। তবে তার পরিচয় এবং অভিজ্ঞতা বিবিসি যাচাই করেছে।

তিনি জানান, ২০১৭ সালে তিনি ‘অসাধারণ দক্ষতা’ ক্যাটাগরির মাধ্যমে স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা পান, যা নিজ নিজ ক্ষেত্রে শীর্ষ পর্যায়ের পেশাজীবীদের জন্য নির্ধারিত।

জর্জ বলেন, অভিবাসীদের বিষয়ে যাচাই হওয়া উচিত—এতে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে একমত। বিবিসিকে তিনি জানান, বাইডেন প্রশাসন খুব বেশি অভিবাসীকে দেশে ঢুকতে দেওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। তিনি আরো বলেন, যদি তার ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকত, তাহলে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই সমর্থন দিতেন।

তবে জর্জের মূল উদ্বেগ হলো, যেসব মানুষ বহুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে আইন মেনে বসবাস করছেন এবং যাদের কোনো অপরাধের ইতিহাস নেই, তাদেরও এখন সবার সঙ্গে এক কাতারে ফেলা হচ্ছে। তার মতে, এতে প্রকৃত অপরাধী আর সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা হচ্ছে না।

জর্জ বলেন, ‘আমি শুধু চাই—আমাদের মধ্যে যারা সব নিয়ম মেনে চলেছি, তারা যেন তাদের আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারে। আর যারা জালিয়াতি বা অপরাধ করেছে, তাদের যেন আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হয়।’

নিউ ইয়র্ক আইসি’র ব্রুজোন বলেন, ১৯টি দেশের অনেক অভিবাসী শরণার্থী, আশ্রয়প্রার্থী এবং সানাম ও জর্জের মতো বৈধ স্থায়ী বাসিন্দারা ইতিমধ্যেই ব্যাপক যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছেন, যার জন্য বছরের পর বছর সময় লাগে এবং একাধিক স্তরের নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়।

নিউ ইয়র্ক ইমিগ্রেশন কোয়ালিশনের সংগৃহীত তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে শুধুমাত্র নিউ ইয়র্ক রাজ্যে বসবাসকারী ভেনেজুয়েলায় জন্মগ্রহণকারী প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার মানুষ ছিলেন। এই স্থগিতাদেশ অভিবাসন প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে মানুষের জীবনকে ব্যাহত করেছে, যার ফলে তাদেরকে বিশাল অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে ব্রুজোন বলেন।

সানামের স্বামী বিবিসিকে বলেছেন, ‘যদি গত সপ্তাহে ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যদের ওপর আক্রমণ না করা হতো, তবে এই সপ্তাহে, আমার স্ত্রী একজন নাগরিক হতেন। এই সমস্ত নীতি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া দ্রুত তৈরি হয়েছিল।’

সূত্র : বিবিসি

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top