ডেস্ক রিপোর্টঃ ‘বুঝি না, কিচ্ছু বুঝি না। হামার কলজার টুকরা বেটাটাক আনি দেও, তাই যেংকা গেছিল সেংকা আনি দেও। ওক মাইরব্যে ক্যা, ওই তো ওমাক শান্তি দিবার গেছিল।’ এই আহাজারি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মহদিপুর ইউনিয়নের আমলাগাছি (ছোট ভগবানপুর) গ্রামের বৃদ্ধ মা ছকিনা বেগমের।
দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনের লজিস্টিক বেইসে গত শনিবার সন্ত্রাসীদের মারাত্মক ড্রোন হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যে ছয়জন সদস্য নিহত হয়েছেন, তাঁদের একজন মো. সবুজ মিয়া ছকিনা বেগমের ছেলে।
নিহত দুই তরুণ সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম (৩৮) ও সৈনিক শান্ত মণ্ডলের (২৬) কুড়িগ্রামের বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। শান্ত মণ্ডলের পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী দিলরুবা খন্দকার বৃষ্টি বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। বলছিলেন, ‘সে (শান্ত) আমাকে ছেড়ে যেতে পারে না। সে আমাকে কথা দিয়েছিল দ্রুত ফিরে আসবে।’
সৈনিক মো. মমিনুল ইসলামের (৩৮) বাড়িতেও একই অবস্থা। তাঁর মা মনোয়ারা বেগমের কান্না, ‘মোর বাপটা কারো ক্ষতি করে নাই, তাও কেন ওরা মোর বাপক মারি ফেলাইল?’
নাটোরের করপোরাল মো. মাসুদ রানা, রাজবাড়ীর সৈনিক শামীম রেজা, কিশোরগঞ্জের মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম—সবার পরিবারেই চলছে এই আহাজারি। শোকার্ত এলাকাবাসীও।
ছোট ভগবানপুর শোকে স্তব্ধ : গতকাল রবিবার দেখা যায়, লন্ড্রি কর্মচারী সবুজ মিয়ার গ্রাম গাইবান্ধার ছোট ভগবানপুর শোকে স্তব্ধ। বৃদ্ধ মা ছকিনা বেগম বারবার চিৎকার করে মূর্ছা যাচ্ছেন। মুখ ঢেকে কাঁদছেন স্ত্রী নূপুর আক্তার (১৮)। দেড় বছরের বিবাহিত জীবনের প্রিয় মানুষটির নিথর দেহ ফিরলে তিনি কিভাবে নিজেকে সামলাবেন—এই আলোচনা সেখানে। স্বজনরা জানান, ২০০২ সালে শৈশবে বাবাকে হারান সবুজ।
২০১০ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে লন্ড্রি কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন। দেড় বছর আগে নাটোরে বিয়ে করেন। স্ত্রী এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তিন মাস আগে ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন। এরপর ফিরে যান কর্মস্থলে। মা ছকিনা বেগম বুক চাপড়ে বললেন, ‘বুঝি না, কিচ্ছু বুঝি না হামার কলজার টুকরা বেটাক আনি দেও।’
স্ত্রী নূপুর আক্তার চিৎকার করে বলেন, ‘আমার স্বামী যেমন থাকুক, যে পরিস্থিতিতে থাকুক, তাড়াতাড়ি আমার কাছে ফিরিয়ে দেন।’
ফেরার প্রতিশ্রুতি রক্ষা হলো না, পরিবারে শোকের মাতম : কুড়িগ্রাম হারিয়েছে দুই শান্তিরক্ষী সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম ও সৈনিক শান্ত মণ্ডলকে। বিশ্বশান্তির জন্য জীবন দেওয়া এই দুই সৈনিকের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহত শান্ত মণ্ডল জেলার রাজারহাট উপজেলার ছাট মাধাই গ্রামের মণ্ডলপাড়ার বাসিন্দা। তিনি সাবেক সেনা সদস্য নুর ইসলাম মণ্ডল ও সাহেরা বেগমের ছোট ছেলে। তাঁর বড় ভাই সোহাগ মণ্ডলও বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত। নিহত আরেক সেনা সদস্য মমিনুল ইসলামের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার উত্তর পাণ্ডুল গ্রামে।
শান্ত মণ্ডল ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন।
সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম ১৮ বছর আগে সৈনিক পদে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এ বছর নভেম্বর মাসের ৫ তারিখে তাঁরা জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে সুদানে যান।
গতকাল বিকেলে রাজারহাট উপজেলার ছাট মাধাই গ্রামের মণ্ডলপাড়া ও উলিপুর উপজেলার উত্তর পাণ্ডুল গ্রামের বাড়িতে শান্ত মণ্ডলের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী দিলরুবা খন্দকার বৃষ্টি ‘আমার শান্তকে এনে দাও’ বলে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।
মমিনুল ইসলামের মা মনোয়ারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছয় মাস থাকি ছাওয়া মোর বিদেশ যাওয়ার জন্য টেইনিং (প্রশিক্ষণ) করিল। পরে অক্টোবর মাসে ২০ দিনের ছুটিতে আসি সগার কাছত দোয়া নিল। নভেম্বর মাসে যাওয়ার সময় আমায় জড়ায় ধরে বলে, মা কান্না করো না। আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসমো।’
৩৭ দিন আগে মিশনে গিয়েছিলেন মাসুদ রানা : নাটোরের লালপুর উপজেলার বোয়ালিয়াপাড়া গ্রামের মৃত সাহার মালিথার ছেলে করপোরাল মাসুদ রানার বাড়িই শুধু নয়, পুরো গ্রামে শোকের মাতম।
বাড়িতে মাসুদ রানার মা বারান্দায় মাদুর পেতে চোখ বুজে শুয়ে রয়েছেন। তিনি জানান, মাত্র এক মাস সাত দিন হলো শান্তি রক্ষা মিশনে গেছেন মাসুদ রানা। তাঁর প্রশ্ন, এখন কী হবে নাবালক নতনি ও তাঁর পুত্রবধূর। তিনি আরো বলেন, “গতকাল দুপুরে ভিডিও কলে ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে। ডিউটির কষ্টের কথা জানতে চাইলে সে বলল, ‘মা এখন আর কষ্ট নাই, ডিউটি কম।’ আমাকে ভালো থাকতে বলে ছেলে নিজেই চলে গেল।”
মাসুদ রানার স্ত্রী আসমাউল হুসনা আঁখিও স্বামীর মৃত্যুর সংবাদে শোকে প্রায় স্তব্ধ। কথা বলতে গিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। তিনি ‘একবার স্বামীর মুখটা দেখতে চাই’ বলেই আবারও মুর্ছা যান।
মসুদ রানার চাচা নাহার উদ্দিন জানান, তিন ভাইয়ের মধ্যে মাসুদ রানা ছিলেন সবার বড়। মাসুদ রানা ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তাঁর মেজো ভাই মনিরুল ইসলাম ২০১২ সালে এবং ছোট ভাই রনি আলম ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সর্বশেষ শান্তি রক্ষা মিশনে যাওয়ার আগে মাসুদ রানা যশোর ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন।
মাসুদ রানার ছোট ভাই রনি আলম বলেন, ‘ভাই হারানোর শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। দেশের জন্য আমার ভাই শহীদ হয়েছেন। এই আত্মত্যাগে আমরা গর্বিত।’
পাকুন্দিয়ায় শোক : নিহত সেনা সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলম কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের তারাকান্দি গ্রামের কৃষক হজরত আলীর ছেলে। তাঁর স্ত্রী এবং তিন বছর বয়সের ইরফান নামের এক ছেলেসন্তান রয়েছে। জাহাঙ্গীর আলমের গ্রামের বাড়িতে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারিতে পুরো গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী রুবাইয়া আক্তার আহাজারি করে কাঁদছিলেন। তাঁকে সান্ত্বনা দিতে ঘরভর্তি মানুষ।
জানা যায়, ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর সেনাবাহিনীতে যোগ দেন মো. জাহাঙ্গীর আলম। এ বছরের ৭ নভেম্বর তিনি জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে অংশ নেন। মিশনে যাওয়ার মাত্র এক মাস সাত দিনের মাথায় তাঁর মৃত্যুর খবরে পুরো পরিবার প্রায় বাকরুদ্ধ।
জাহাঙ্গীরের বাবা হজরত আলী জানান, তাঁর তিন সন্তানের মধ্যে জাহাঙ্গীর দ্বিতীয়। শনিবার রাত ১২টার দিকে সৌদি আরব থেকে তাঁর বড় ভাইয়ের কাছ থেকে মোবাইল ফোনে জাহাঙ্গীর আলম নিহত হওয়ার খবর পান। গতকাল সকাল ১০টার দিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ক্যাপ্টেন ইমরান নামের একজন অফিসার মোবাইল ফোনে ছেলের মৃত্যুর সংবাদটি নিশ্চিত করেন। জাহাঙ্গীর দম্পতির তিন বছরের একটি ছেলেসন্তান রয়েছে।
বোনের বিয়ের জন্য সোনার হার আনতে চেয়েছিলেন : সুদান থেকে ফিরে এসে একমাত্র ছোট বোন মরিয়ম বেগমের (১৪) বিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক শামীম রেজা ওরফে শামীম ফকিরের। বোনের বিয়েতে দেওয়ার জন্য সোনার হার নিয়ে ফেরার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু সেই হার আর আনা হলো না। শামীম রেজার মৃত্যুর খবরে রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার মৃগী ইউনিয়নের হোগলাডাঙ্গী গ্রামে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
শামীম রেজার বাবা আলমগীর ফকির আহাজারি করে বলেন, “গত শুক্রবার শেষবারের মতো ছেলের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়। ওর চোখ ফোলা ছিল। বলেছিল, ঘুম থেকে উঠেছি তাই চোখ এমন। এরপর বলল, ‘আব্বা, হাতে সময় নেই, ডিউটিতে যেতে হবে।’ এরপর আর কোনো কথা হয়নি। এখন ফিরবে লাশ হয়ে। ছেলে দেড় বছর আগে বিয়ে করেছে। এখনো তার কোনো সন্তান হয়নি। কত স্বপ্ন ছিল ছেলেকে নিয়ে।”
শামীম রেজা ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন। চলতি বছরের ৭ নভেম্বর জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে অংশ নিতে তিনি সুদানে যান। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে সন্ত্রাসী হামলায় তিনি নিহত হন।
রাজবাড়ী সেনা ক্যাম্পের ইনচার্জ মেজর মোস্তফা সাইফ বলেন, ‘পরিবারকে সান্ত্বনা দিতেই আমরা এখানে এসেছি। আশা করছি, আগামী দুই দিনের মধ্যেই শামীমের মরদেহ বাংলাদেশে আনা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রাপ্য সব সুযোগ-সুবিধা দ্রুত পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।’







