যাত্রা শুরু নির্বাচনি ট্রেনের

9-6938804066204.jpg

ডেস্ক রিপোর্টঃ নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন যে কোনো সময় তফসিল ঘোষণার উদ্বোধনী হুইসেল বাজাতে প্রস্তুত। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আজ সিইসি এবং চার নির্বাচন কমিশনার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। পরে বিকেলে সিইসির জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণ বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে প্রচারের জন্য রেকর্ড করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এই ভাষণেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল প্রকাশ করা হবে।

বিশ্বস্ত সূত্রের তথ্যে জানা গেছে, ভাষণ রেকর্ড হলেও আজই তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা কম। কমিশন বৃহস্পতিবার তফসিল প্রকাশ করতে পারে। আর ভোট গ্রহণ হতে পারে ১১ বা ১২ ফেব্রুয়ারির যেকোনো একদিন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনারদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেন।

এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে পুনরায় একটি নির্বাচিত সরকার গঠনের পথ খুলে যাচ্ছে। পাশাপাশি গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবের ভাগ্যও নির্ধারিত হবে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে তফসিল ঘোষণার প্রয়োজনীয় প্রায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সিইসি সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত কমিশন একাধিক বৈঠক করে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি যাচাই করে। এদিন সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) গেজেট প্রকাশ করা হয়। তবে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি এবং নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালার সংশোধিত গেজেট রাত পর্যন্ত প্রকাশ হয়নি।

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব নির্বাচন দেশে স্বৈরশাসনের পথ তৈরি করে। গত ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে এটাই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি–এনসিপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে, এবং প্রার্থীরা এলাকাভিত্তিক প্রচারণা শুরু করেছেন। এর ফলে দেশজুড়ে নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও নির্বাচনের দিকে নজর রাখছে।

তবে এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দলটির কার্যক্রম স্থগিত থাকায় এবং নির্বাচন কমিশনে দলটির নিবন্ধন অবরুদ্ধ থাকায় তারা প্রতিযোগিতা থেকে বাইরে রয়েছে। সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাসহ পলাতক অনেক নেতা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতাও হারিয়েছেন। অন্যদিকে জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের নিবন্ধিত শরিকরা চাইলে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। কমিশনের ধারণা, আ.লীগ না থাকায় এবার ভোটের অংশগ্রহণ ৭০ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে। আগের তিনটি নির্বাচনে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত বহু তরুণ এবার ভোট দিতে উদগ্রীব।

নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, তফসিল ঘোষণার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। কোন আসনে কোন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন—এসব প্রজ্ঞাপনসহ প্রায় ২০টি পরিপত্রের খসড়া তৈরি রাখা হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর এগুলো ধাপে ধাপে জারি হবে। তিনি আরও বলেন, আচরণবিধি ও পরিচালনা বিধিমালার সংশোধিত গেজেটও দ্রুত প্রকাশ করা হবে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলি জানান, দেশবাসী উৎসবমুখর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অপেক্ষায় আছেন। রাজনৈতিক দলগুলোও তখন থেকেই প্রস্তুতির মধ্যে আছে। তবে তিনি মনে করেন, নির্বাচনি পরিবেশ অনুকূল থাকলে ইসির অনেক চ্যালেঞ্জ সহজ হয়ে যাবে।

ইসি সূত্র জানায়, এবার দেশের ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। ভোটকেন্দ্র থাকবে ৪২ হাজার ৭৬৬টি এবং ভোটকক্ষ হবে দুই লাখ ৪৫ হাজার ১৯৫টি। যেহেতু জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে, তাই প্রতিটি ভোটকক্ষে দুটি করে গোপন কক্ষ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে অবকাঠামোগত সুবিধা নেই, সেখানে অতিরিক্ত ভোটকক্ষ তৈরি করা হবে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধন, পর্যবেক্ষক অনুমোদন, আইন সংস্কার, সীমানা পুনঃনির্ধারণ, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সংলাপ, ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং প্রবাসীদের জন্য আইটি-ভিত্তিক ডাক ভোট চালু করা হয়েছে। সীমানা নির্ধারণ নিয়ে ৩০টির বেশি রিট থাকলেও তফসিল ঘোষণায় কমিশন কোনো বাধা দেখছে না।

এদিকে, স্থগিতাদেশের কারণে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই—এ তথ্য আরও স্পষ্ট হয়েছে প্রবাসীদের ডাক ভোটের চূড়ান্ত ফরম্যাটে দলটির প্রতীক ‘নৌকা’ বাদ পড়ায়। জাতীয় পার্টির লাঙ্গলসহ অন্যান্য নিবন্ধিত দলের প্রতীক সেখানে রয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সাংবাদিকদের বলেন, স্থগিত থাকা দলের প্রতীক পোস্টাল ব্যালটে রাখা হচ্ছে না। আইন যাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়, শুধু তারাই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে।

তিনি আরও জানান, এ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ। তফসিল ঘোষণার পর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি ইসির দায়িত্ব হবে, তবে রাজনৈতিক সংঘর্ষ হলে তফসিলের আগ পর্যন্ত ইসির কিছু করার নেই।

নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা পদে থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। তিনি বলেন, সরকারি পদে থেকে নির্বাচনি প্রচারণা চালানো যায় না, তাই তারা স্বপদে থেকে প্রার্থী হতে পারবেন না।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top