ডেস্ক রিপোর্টঃ রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ–২০২৫’ বাস্তবায়নে যে গণভোট আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে, তাকে কেন্দ্র করে নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কোনো কারণে গণভোটে ‘না’ ভোট বেশি হলে পুরো সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিশ্চিত করতে সরকার, নির্বাচন কমিশন (ইসি), রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে মাঠে নামার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনও গণভোটের পক্ষে সক্রিয় প্রচারণা চালানো নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান তৈরি হয়নি।
সরকার ইতোমধ্যে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং নির্বাচন কমিশনও শিগগিরই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই আলাদা ব্যালটে একটি প্রশ্নের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তরের মাধ্যমে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে প্রশ্নটি চারটি অংশে বিভক্ত থাকবে।
সংবিধানে গণভোটের বিধান না থাকায় সরকার ইতোমধ্যেই একটি অধ্যাদেশ জারি করেছে এবং সেই অনুযায়ী বিধিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) যে সংশোধনী প্রয়োজন, তাও অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। ইসি সমান্তরালে অন্যান্য প্রস্তুতিও এগিয়ে নিচ্ছে।
সবকিছু পরিকল্পনামাফিক চললে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির আগেই জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। রোববার ইসির বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ১১ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। তবে চারটি প্রশ্নকে এক উত্তরের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হওয়ায় নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
৩০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মক ভোটিংয়ে দেখা গেছে, অনেক ভোটার গণভোটের প্রশ্নগুলো বুঝে উঠতে না পারায় না পড়ে বা না জেনে ভোট দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনগণের মধ্যে যথাযথ সচেতনতা তৈরির আগে গণভোট আয়োজন করা হলে বিভ্রান্তি বাড়তে পারে।
তাঁরা বলেন, সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারণা ব্যাপক হবে, কিন্তু গণভোট নিয়ে গ্রামাঞ্চলে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে আলাদা আয়োজন প্রয়োজন। একই দিনে দুটি ভোট হওয়ায় নির্বাচন পরিচালনা থেকে ফল গণনা—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি চাপ থাকবে। বিশেষ করে গণভোটের ফলাফল গণনায় বেশি সময় লাগতে পারে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক মনে করেন, গণভোটের প্রশ্ন জটিল এবং চারটি বিষয় একত্রে থাকার কারণে প্রচার ছাড়া সাধারণ মানুষের বোঝা কঠিন। তিনি আশঙ্কা করেন, প্রচার তীব্র না হলে অনেক ভোটার গণভোটের ব্যালট ফাঁকা রেখে আসতে পারেন।
এদিকে ইসি কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্য দিয়েই গণভোট আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে। একই দিনে দুটি ভোট হওয়ায় অতিরিক্ত বুথ ও ভোটকক্ষ স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, ফলে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার সংখ্যাও বাড়াতে হবে।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজনের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত। মক ভোটিং হয়েছে, এবং একই ভোটারের হাতে দুটি ব্যালট থাকায় সময় বেশি লাগতে পারে। তাই সময় বাড়ানো ও অতিরিক্ত বুথ স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
সরকারও গণভোট বিষয়ে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার, ধর্ম, শিক্ষা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় যুক্ত করা হচ্ছে। পরে আরও মন্ত্রণালয় যুক্ত হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, ভিডিও, পোস্টার, তথ্যচিত্র তৈরির কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিতে চাওয়া হচ্ছে। মসজিদের ইমামদের জুমার খুতবায় গণভোট সম্পর্কে বক্তব্য রাখার জন্য প্রাথমিক আলোচনা চলছে। তাঁদের জন্য বিশেষ ওরিয়েন্টেশন আয়োজন করা হতে পারে। পাশাপাশি ওয়াজ মাহফিলেও গণভোট বিষয়ে সচেতনতা তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, গণভোট হলো অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কর্মসূচির মূল ভিত্তি। তাই সরকার সরাসরি প্রচারণায় অংশ নিচ্ছে। জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের সম্ভাব্য প্রভাব বোঝানো হবে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনও ভিন্নমত রয়েছে। বিএনপি ও বেশির ভাগ দল এক প্রশ্নে চারটি বিষয়ের উত্তর দেওয়াকে অযৌক্তিক বলে মনে করছে। তাঁদের প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচার চালালেও গণভোট বিষয়ে কোনো প্রচার করছে না। জামায়াত ও ইসলামী দলগুলো ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে থাকলেও এখনো আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেনি। বামদলগুলো গণভোটকে অপ্রয়োজনীয় বলছে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, চারটি বিষয়ের ওপর এক উত্তরের বাধ্যবাধকতা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। ‘না’ জয়ী হলে তা দেশের জন্য নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরও বলেন, গণভোট নিয়ে জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব মূলত সরকার ও নির্বাচন কমিশনের।







