উপকূলে দক্ষ জনশক্তি গড়তে ভূমিকা রাখছে ‘কয়রা আইটি স্কুল’

21054.jpg

নিজস্ব প্রতিবেদক :
সারাদেশ যখন তথ্য ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন পিছনে পড়ে ছিল উপকূলীয় জনপদের শিক্ষার্থিরা। তথ্য ও প্রযুক্তির নুন্যতম জ্ঞান ছিল না তাদের। কিন্তু তারা জানতো সরকারি-বেসরকারি চাকুরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি সবকিছুই প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়ছে। স্বচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থিরা সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি শহরে গিয়ে আইটি প্রশিক্ষণ নিতে পারলেও অস্বচ্ছলদের সে সুযোগ ছিল না।

তথ্য প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা উপকূলের মেধাবি শিক্ষার্থিদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে এগিয়ে আসেন খুলনার কয়রা উপজেলার মদিনাবাদ গ্রামের আল-আমীন ফরহাদ। তিনি ২০১১ সালে কয়রা উপজেলা সদরে ‘কয়রা আইটি স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। একটি দ্বিতল ভবনের তিনটি ভাড়া করা কক্ষে প্রথমে একটি কম্পিউটার ও ৫ জন শিক্ষার্থি নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে দুই শিফটে ১৬০ জন শিক্ষার্থি প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আল আমীন ফরহাদ জানান, খুলনার সরকারি ব্রজলাল কলেজ থেকে মাস্টার্স শেষ করে চাকুরির জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। সে সময় চাকুরির জন্য যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সাক্ষাৎকার দিতে হয়েছে সব প্রতিষ্ঠানেই তথ্য-প্রযুক্তিতে দক্ষতার বিষয়ে জানতে চেয়েছে তারা। কিন্তু সে সময় এ বিষয়ে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা না থাকায় টিকে থাকতে পারেননি তিনি। এক সময় হতাশ হয়ে পড়েন। তখন মাথায় আসে এলাকায় একটি আইটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার। বাবার কাছ থেকে পাওয়া ৫ লাখ টাকা নিয়ে শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ছড়াতে থাকে। শহরে গিয়ে যারা আইটি প্রশিক্ষণ নিতেন তারাও এলাকার প্রতিষ্ঠানটিতে ফিরতে শুরু করেন। প্রতিষ্ঠানের সফলতায় এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারিভাবে একাধিকবার পুরষ্কারও পেয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে যুব প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থি জাকিয়া সুলতানা বলেন, এলাকায় এ প্রতিষ্ঠানটি হওয়ায় আমার মতো অনেক নারী শিক্ষার্থি উপকৃত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি না থাকলে আমাদের পক্ষে শহরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া সম্ভব হতো না। এখানে অল্প খরচে প্রশিক্ষণ শেষ করতে পারছি আমরা।

একই কথা বলেন আরেক প্রশিক্ষণার্থি রাসেল ইসলাম। তিনি বলেন, উপকূলীয় এ উপজেলা থেকে জেলা শহরের দূরুত্ব প্রায় একশ কিলোমিটার। এ কারণে ইচ্ছা থাকলেও অনেকের সামর্থে কুলায় না। যাদের স্বচ্ছলতা আছে তারা শহরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে পারে। অনেকেই তা পারে না। এখানে অনেকেই বিণা বেতনে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছে। এ জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি এলাকায় অনেক সুনাম ছড়িয়েছে।

স্থানীয় অভিবাবকরা জানিয়েছেন, স্কুল ও কলেজে আইসিটি বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হলেও সেখানে শিক্ষার্থিদের সময় দেওয়া হয় কম। এছাড়া সেখানে হাতে-কলমে শিক্ষা পাওয়া সম্ভব হয় না। এ কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থিদের আগ্রহ বাড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদাভাবে আইসিটি প্রশিক্ষণের সনদ পাওয়া যায়। যা ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়।

কয়রা আইটি স্কুলের শিক্ষার্থিরা জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে একটি আধুনিক ল্যাব রয়েছে। সেখানে হাতে-কলমে আইসিটির সকল বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। সেখানকার কোর্স সমূহের মধ্যে-অফিস এপ্লিকেশন, ডাটাবেজ, ডিজিটাল পেইন্ট, ফটোসপ, ইলেষ্ট্রেটরসহ ডিজিটাল মার্কেটিং, ডাটাএন্ট্রি, গ্রাফিক্স ডেজাইনের কাজ শেখানো হয়। এছাড়া ৬ মাস পরপর কর্মসংস্থান সহায়ক কোর্স যেমন, যুব উন্নয়ন ও বিভিন্ন এনজিও’র সহায়তায় মৎস্য, গবাদি পশু পালন, সেলাই প্রশিক্ষণেরও আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি। এতে আত্ম নির্ভরশীল হয়ে উঠছে শিক্ষার্থিরা।

এছাড়া চাকুরি বাজারে দক্ষ করতে আবেদন প্রক্রিয়া, সিভি প্রস্তুত, ভাইবা বোর্ডে আত্মবিশ^াস বাড়াতে শিক্ষার্থিদের বুদ্ধি বৃদ্ধিমূলক কর্মশালা আয়োজন করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষার্থিদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, অফিসে কাজের সুযোগ করে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠাকালিন সময় থেকে এখন পর্যন্ত এখান থেকে প্রায় দুই হাজারের মতো শিক্ষার্থি প্রশিক্ষণ শেষ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন।

বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটির সফলতা দেখে এলাকায় একই রকম আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সেখানেও প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন এলাকার শিক্ষার্থিরা।

প্রতিষ্ঠানটির প্রশিক্ষক রবিউল ইসলাম বলেন, প্রশিক্ষণ শেষে পরীক্ষায় উত্তীর্ন শিক্ষার্থিদের জাতীয় কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সনদপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এই সনদপত্র সরকারি ও বেসরকারি চাকুরির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top