ডেস্ক রিপোর্ট :
লিকলিকে শরীর। পরনে পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি। পুরোটাই সন্তানের রক্তে রঞ্জিত। রাত সাড়ে ১১টার সময়ও সন্তানের রক্তজমাট বাঁধা ছিল পাশের রাস্তায়। সড়কবাতির নিচে দাঁড়িয়ে তিনি বলছিলেন, আমার ছেলেকে খুন করেছে রায়হান। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিলেন জন-দশেক লোক।
নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার খোন্দকারাবাদ ফতেপুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে ছেলে সরোয়ার হোসেন বাবলা খুনের প্রত্যক্ষদর্শী বাবা আবদুল কাদের করছিলেন সেই দৃশ্যের বর্ণনা।
শোকে পাথর আবদুল কাদের বলছিলেন, প্রায় সময় ফোনে আমার ছেলেকে গালিগালাজ করতো রায়হান। হুমকি দিতো। তারা মনে করতো বুড়ির নাতি সাজ্জাদকে গ্রেপ্তারের পেছনে আমার ছেলের হাত আছে। আমরা সাজ্জাদের অনুসারী রায়হানসহ চারজনের বিরুদ্ধে থানায় জিডিও করেছিলাম। সরোয়ারের আইনজীবীসহ অনেকেই তাকে সতর্ক থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু বাড়ির সামনে এভাবে খুন করতে পারে তারা ভাবেননি।
সরোয়ারের মা বলেন, আমার ছেলেকে কেন মেরে ফেললো। আমার ছেলে তো কারো ক্ষতি করেনি। এসময় পাশ থেকে তার স্ত্রী বলতে থাকেন, আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দাও।
কে এই রায়হান
চট্টগ্রামের রাউজান থানার দক্ষিণপূর্ব রাউজানের মুন্দার খলিফার বাড়ির মৃত বদিউল আলমের ছেলে মো. রায়হান। ৩৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তি এখন চট্টগ্রামের মূর্তিমান আতঙ্ক। তার বিরুদ্ধে একের পর এক খুনের অভিযোগ উঠলেও পুলিশ তাকে ধরতে পারছে না। তার বিরুদ্ধে গত ১৪ মাসে নয়টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
রায়হান আরেক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। সাজ্জাদ বিদেশে পালিয়ে থাকা দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারী। তার হয়ে চট্টগ্রামের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন ছোট সাজ্জাদ। গত ১৫ মার্চ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলেও তার অপরাধ কার্যক্রম থেমে নেই।
তাদের ধরতে না পারা প্রসঙ্গে গতকাল বুধবার সরোয়ার খুনের ঘটনার পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ বলেন, এই ঘটনার মূল কুশিলবসহ অনেকেই কিন্তু বর্তমানে জেলে আছে। দেশের বাইরে থেকেও নানা রকমের ইন্ধন আসতেছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের সঙ্গে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের যোগসাজশ রয়েছে। তাদের আস্তানা অনেক দুর্গম এলাকায়। আমরা সেখানেও অভিযান পরিচালনা করেছি। কিন্তু সেখানে তাদের খুঁজে পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। তারা মোটরসাইকেলে এসে ঘটনা ঘটিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চলে যায়।
হাসিব আজিজ আরও বলেন, নির্বাচনী জনসংযোগের সময় নগর বিএনপির আহ্বায়কসহ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে কাজ শুরু করেছে পুলিশ। বিষয়টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার খোন্দকারাবাদ ফতেপুকুর এলাকায় তানিয়া স্টোরের সামনে চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর গণসংযোগে কাঁধে পিস্তল ঠেকিয়ে সরোয়ার হোসেন বাবলাকে হত্যা করা হয়। এতে প্রার্থী এরশাদ উল্লাহসহ ৫ জন গুলিবিদ্ধ হন।
গুলিবিদ্ধ অন্য তিনজন হলেন– ইরফানুল হক শান্ত, আমিনুল হক ও মর্তুজা হক। শান্ত ৩ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক। বাকি দুজনও বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। এরশাদ উল্লাহসহ অন্য তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় সেদিন সন্ধ্যায়।
বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের সঙ্গে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ ছিল সরোয়ার হোসেন বাবলার। সাজ্জাদ কারাগারে রয়েছেন। কিন্তু তাঁর অনুসারীদের কেউ এ খুনে জড়িত কিনা– খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম নগরীতে সংসদীয় আসন চারটি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও-পাঁচলাইশ-বায়েজিদ আংশিক) আসনে গত সোমবার নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর নাম ঘোষণা করা হয়।







