নিজস্ব প্রতিবেদক :
সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনা, ন্যায়-অন্যায় কিংবা কোন ভাল কাজ, যা-ই দেখেন তাই নিয়ে কথার মালায় ছন্দ গাঁথেন তিনি। পথ চলতে, হাট-বাজারে, সভা-সমাবেশে গিয়েও মানুষের দুঃখ-দুর্দশা অথবা আশা-দুরাশার বিষয়গুলিও গেঁথে ফেলেন কবিতার পংক্তিমালায়। তার চালচলন, ভাবভঙ্গি, কথাবার্তায় অনেকেই ‘পাগল’ মনে করে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। কিন্তু সেসব গায়ে মাখেন না তিনি। আপন বলয়ে গড়েছেন নিজের পৃথিবী। কবিতার বাইরে আর কোন জগৎ নেই তার। সেখানেই উৎসর্গ করেছেন নিজেকে। বয়স সত্তর পেরিয়েছে। এখন পর্যন্ত লিখেছেন সত্তর হাজারের বেশি কবিতা। সেসব কবিতা পান্ডুলিপি আকারে সংরক্ষিত করে রেখেছেন নিজের গড়া পাঠাগারে। দেশের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের অনুষ্ঠানে নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা।
নিভৃতচারি এই ব্যাক্তির নাম আব্দুর রাজ্জাক। খুলনার কয়রা উপজেলার মদিনাবাদ গ্রামের বাসিন্দা হওয়ায় নামের শেষে মদিনাবাদী যোগ হয়েছে। ২০১২ সালে পোস্ট অফিসের সহকারি পরিদর্শক পদ থেকে অবসর নিয়ে ভবঘুরে জীবনযাপন বেছে নিয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক মদিনাবাদী। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত যাতায়াত করেছেন তিনি। অঞ্চল ভিত্তিক মানুষের জীবন-যাপন, সভ্যতা, সংস্কৃতি সবকিছুই পর্যবেক্ষণ করেন এবং তুলে আনেন কবিতায়। বাড়ির পাশে কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদী। নদী পাড়ের ভাঙন কবলিত মানুষের কষ্টের জীবনবৈচিত্রও উঠে এসেছে তার লেখনিতে। দেশের সাহিত্য অঙ্গনে খুব বেশি পরিচিত না হলেও স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় তার লেখা ছাপা হয় মাঝেমধ্যে। বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পাঠ করেন নিজের লেখা কবিতা। যে কোন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেলে সেখানে বসেই ছন্দেবন্দে লিখে ফেলেন কয়েক লাইন। স্থানীয় মানুষের কাছে গ্রাম্য কবি মদিনাবাদী হিসেবে পরিচিত।
ব্যাক্তি জীবনে দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়েই বর্তমানে স্বচ্ছল সংসার তার। বড় ছেলে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ছোট ছেলে আমেরিকা প্রবাসী এবং সেখানকার নাগরিকত্ব পেয়েছেন। তবে শৈশবে মাতৃহারা আব্দুর রাজ্জাকের জীবনের প্রথম অধ্যায়টা ছিল কষ্টের। পিতার দ্বিতীয় বিয়ের পর দাদির কাছে থেকেই বড় হয়েছেন অভাব-অনটনের মধ্যে। ম্যাট্রিক পাশ করার পর ১৯৮০ সালে পোস্ট অফিসের পিয়ন পদে চাকুরি জীবন শুরু। পরে সহকারি পরিদর্শক পদোন্নতি পেয়ে ২০১২ সালে অবসর নেন। অবসরকালিন পাওয়া টাকা দিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘রাজরতœ সাহিত্য পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন। সেখানে ছোট একটি পাঠাগারও রয়েছে। এলাকার সাহিত্যানুরাগী ও বইপ্রেমী মানুষের অবাধ যাতায়াত রয়েছে সেখানে।
আব্দুর রাজ্জাক বলেন, জীবনে নির্দিষ্ট কোন চাওয়াপাওয়া নেই, কিংবা কোন আক্ষেপও নেই। তবে মানুষের সঙ্গে মানুষের অন্যায় আচারণগুলো কষ্ট দেয়। মানুষ সামান্য স্বার্থের জন্য সমাজে অশান্তি বাধায়, কলহ করে, অন্যকে ঠকায়- এসব দেখে মর্মাহত হই। সেসব দেখি, ভাবি আর লিখি। আমার প্রতিবাদ আমার লেখায়। লেখাগুলো যতেœ রেখে দিয়েছি আমার সন্তানদের মতো করে। কোন দিন এই লেখাগুলো যদি কারো অনুপ্রেরণা হয় তাহলেই স্বার্থক হবো। সেটা আমার জীবদ্দশায় অথবা মৃত্যুর পর।
আব্দুর রাজ্জাকের বড় ছেলে স্কুল শিক্ষক নুরুল আমীন বলেন, বাবাকে ছোটকাল থেকেই দেখে আসছি সমাজ-সংসারের প্রতি উদাসীন। আমার মা সংসারের সবকিছু সামলে বাবাকেও সামলেছেন। অনেক সময় বাবার বেতনের টাকা কোন অভাবি মানুষকে দান করে দিয়ে খালি হাতে বাড়ি এসেছেন। মা ধার-দেনা করে সংসার চালিয়েছেন। আমাদের মানুষ করেছেন। বাবা চাকুরির পাশাপাশি লেখালেখি করেন। সেই লেখা আমাদের পড়ে শুনান। তার লেখার প্রধান পাঠক ছিলাম আমরা দু’ভাই ও আমার মা। মাঝেমধ্যে মা বিরক্ত হয়ে বকাবকি করেন, কিন্তু বাবা সেই একই ধারায় চলছেন। কয়েক বছর তিনি আমেরিকায় গিয়ে আমার ছোট ভাইয়ের কাছে ছিলেন। সেখানে গিয়েও অসংখ্য কবিতা লিখেছেন। সেখানকার বাঙালিদের নিয়ে সাহিত্য সভাও করেছেন। দেশে চলে আসার পর সেসব প্রবাসীরা নিয়মিত বাবার খোঁজখবর নেন।
স্থানীয় কপোতাক্ষ মহাবিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক আব্দুল মালেক বলেন, একজন কবি তার জীবন ও অভিজ্ঞতাকে কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করেন। কোন স্বীকৃতির আশায় লেখেন না কেউ। কবিরা নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন কবিতার ছন্দে। নিজস্ব জগতেই তাদের অবাধ বিচরণ। জগতের অন্য কিছুই তাকে আকৃষ্ট করে না। তেমনই একজন আব্দুর রাজ্জাক মদিনাবাদী। তার কবিতায় উঠে এসেছে সমাজের চিরাচরিত দৃশ্যগুলি। সহজ সরল ভাষায় লেখা কবিতাগুলো সহজে বোধগম্য হয় পাঠকের। গ্রামের এসব নিভৃতচারি ব্যাক্তির লেখাগুলো সংরক্ষিত হলে সমৃদ্ধ হতে পারে দেশের সাহিত্যভান্ডার।







