ন্যায়বিচারের অদৃশ্য বাধা বিচারকের অনুপাতে জনসংখ্যা

1761776908372-1.jpg

মামলার জটের বোঝা, বিচারকের উপর চাপ আর বিচারপ্রার্থীদের অনিশ্চয়তা নিয়ে ন্যায়বিচারের কঠিন বাস্তবতার এক দৃশ্য। কার্টুন : প্রতিবেদক।

আওয়াল শেখ, ফ্রিল্যান্সিং প্রতিবেদক

বিচারব্যবস্থা একটি রাষ্ট্রের ন্যায়, নীতি ও গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ। আইনের শাসন যে সমাজে দৃঢ়, সে সমাজই টেকসই, মানবিক ও উন্নত। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থারও অন্যতম স্তম্ভ বিচার বিভাগ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিচার বিভাগ স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে বহু সমালোচনা পড়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। যেখানে বিচারকের অভাব ও মামলার অতিরিক্ত চাপের কারণে ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বিলম্ব হচ্ছে। যা আদালতের কাজের গতি ধীর এবং মামলার জট অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে—ফলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

 জনসংখ্যার অনুপাতে বিচারকের সংখ্যায় বৈষম্য

সুপ্রিম কোর্টের সেপ্টেম্বর মাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন আদালতে প্রায় ৪৬ দশমিক ৫২ লাখেরও বেশি মামলা এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে নিম্ন আদালতেই (মেট্রোপলিটন ও জেলা আদালত) রয়েছে প্রায় ৩৯ লাখ মামলা, যা মোট মামলার প্রায় ৮৫ শতাংশ। নিম্ন আদালতের এই বিশাল মামলার ভারের ফলে বিচারকরা চরম চাপের মধ্যে কাজ করছেন। ফলে মামলার শুনানি ধীরগতি ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচারের পৌঁছানো সহজ হয়ে ওঠেনি।

আইন মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগীয় পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২,৩০৭ জন বিচারক নিম্ন আদালতে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটির বেশি— অর্থাৎ প্রতি বিচারকের জন্য প্রায় ৮০,০০০ মানুষ। বিশ্বব্যাপী গড় হিসেবে প্রতি ২০,০০০ জনে একজন বিচারক থাকলেও, বাংলাদেশে তা চারগুণেরও বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনুপাত বিচারপ্রক্রিয়ার গতি ব্যাহত করছে এবং বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি করছে। নিম্ন আদালতের এই চাপের কারণে মামলার শুনানি প্রায়ই বিলম্বিত হয়। অনেক মামলার রায় পেতে ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে, যা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মো. মাছুম বিল্লাহ বলেন, বিচারক–সংকট, মামলার আধিক্য, মামলার প্রতিবেদন দেরিতে আসা, অভিযোগপত্রে নারাজি, আসামিপক্ষের বারবার সময়ের আবেদন, উচ্চ আদালতে মামলা স্থগিত করে রাখা, সময়মতো সাক্ষীদের হাজির করতে না পারা, মামলার নিষ্পত্তিতে আইনজীবীদের গাফিলতিসহ বিভিন্ন কারণে বছরের পর বছর ধরে আদালতে মামলা ঝুলে থাকছে। তবে এত সব সংকটের মধ্যে বিচারক–সংকটের কারণটি বিচারপ্রার্থীদের সব থেকে বেশি ভোগাচ্ছে। নাগরিকরা বছরের পর বছর আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরে হতাশ হচ্ছেন।

মামলার দীর্ঘসূত্রিতায় নেতিবাচক প্রভাব

বিচারপ্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রিতা কেবল ব্যক্তিগত সমস্যার সৃষ্টি করছে না, বরং দেশের সামগ্রিক আইনি সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সামাজিক শান্তি— ক্ষেত্রেই এই বিলম্বের নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিচার বিভাগে জনআস্থা মাত্র ৩৭ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের নিচে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদন ও নাগরিক সমাজের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বিচার বিভাগের প্রতি নাগরিকদের প্রচুর অস্বচ্ছতার অভিযোগ রয়েছে।

এই প্রসঙ্গে আইনজীবী বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘ন্যায়বিচার তখনই টেকসই হয়, যখন তা সবার নাগালের মধ্যে থাকে। নিম্ন আদালতের এই ভারসাম্যহীনতা জনগণের মৌলিক অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করছে। যদি বিচারক ও অবকাঠামোর ঘাটতি পূরণ না করা হয়, তবে “ন্যায়বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই ন্যায়বিচার বঞ্চিত হওয়া” এই কথাটিই কি বাংলাদেশের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াবে না? ’

আদালতের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরেও সুরহা হয় না

নিম্ন আদালতের চাপের ফলে সাধারণ মানুষ নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। মামলা দীর্ঘ সময় ধরে স্থগিত থাকায় তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগও তুলছেন।

২০০৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাতে খুলনার রূপসা উপজেলার নৈহাটি ইউনিয়নের রামনগর এলাকায় গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন এক নারী (সম্পাদকীয় নীতির কারনে পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে)। ধর্ষণের অভিযোগে ঘটনাস্থল থেকে দুই ব্যক্তিকে আটক করেছিলেন এলাকাবাসী। পরে তিনজনকে আসামি করে রূপসা থানায় মামলা করেছিলেন তার স্বামী।

আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছিলেন। আর যাঁরা আসামিদের আটক করেছিলেন, তাঁরাও ২২ ধারায় ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন। ওই ঘটনার তিন মাস পর পুলিশ তিনজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়।

কিন্তু মামলাটি এখন কোন পর্যায়ে আছে, তা জানেন না বাদী। আদালতে কয়েকবার খোঁজ নিতে গেলেও মামলার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তাকে কিছুই জানানো হয়নি। এমনকি বাদীকে সাক্ষীর জন্যও কখনো ডাকা হয়নি। ১৫ বছর ধরে ন্যায়বিচার পেতে বাদী আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন।

মামলার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হওয়া মানে শুধু আইনি লড়াই নয়, বরং আর্থিক ও মানসিক চাপও। ওই নারীর স্বামী বলেন, ঘটনার পর থেকে আমার স্ত্রী মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এখনো সেদিনের ঘটনা মনে পড়লে অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন। লোকলজ্জার ভয়ে এলাকাও ছাড়তে হয়েছে। আসামিদের  শাস্তি হলে আমরা মানসিকভাবে শান্তি পেতাম। তবে মামলার যা অগ্রগতি, তাতে দিন দিন হতাশ হয়ে পড়ছি। এই ধীরগতি আমাদের ন্যায় বিচারের বিশ্বাসে ফাটল ধরিয়েছে।

এমন অসংখ্য বিচারপ্রার্থী বছরের পর বছর খুলনার বিভিন্ন আদালতের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরেও মামলার কোনো কূলকিনারা করতে পারছেন না। শুধুমাত্র খুলনার আদালতগুলোতে এমন বিচারাধীন দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা রয়েছে ৯০ হাজারের মতো। আদালত আছে ৫৭টি। এর বাইরে প্রতি মাসে ১০০টির মতো মামলা যুক্ত হচ্ছে আদালতে।

বাদী, আসামি ও আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিচারক–সংকট, মামলার আধিক্যসহ বিভিন্ন কারণে বছরের পর বছর ধরে আদালতে মামলা ঝুলে থাকছে। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বাদী-বিবাদীরা।

দিনের পর দিন মামলা–মোকদ্দমা নিয়ে সাধারণ মানুষের এমন ভোগান্তি সম্পর্কে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সমন্বয়কারী আইনজীবী মোমিনুল ইসলাম বলেন, মামলা নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা বাদী ও বিবাদীকে আর্থিক এবং সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কোনো মামলা বছরের পর বছর পড়ে থাকলে পরে তা নিষ্পত্তিতেও বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। ফলে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা থেকে যায়। এমন পরিস্থিতিতে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

জমির মামলায় সময় ক্ষেপণ বেশি

খুলনার কয়রা উপজেলার বাগালী ইউনিয়নের শেওড়া মৌজায় ১ দশমিক ২ একর জমি ছিল দীলিপ বর্মণের নানা সতীশ চন্দ্র মণ্ডলের। সতীশ চন্দ্র মণ্ডল ছিলেন এ দেশের নাগরিক। কিন্তু ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁর জমিটি অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এতে বিপাকে পড়েন সতীশ চন্দ্র মণ্ডল। তিনি নিজের জমি ফিরে পাওয়ার আশায় আদালতে মামলা করেন। ১৯৯৫ সালে মামলার রায় তাঁর পক্ষে আসে। নিজের জমি ফিরে পান সতীশ চন্দ্র। তবে ২০১১ সালের গেজেটে আবার ওই সম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে দেখানো হয়। ওই বছরই এর বিরুদ্ধে খুলনা যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ (দ্বিতীয়) আদালতে মামলা করেন দীলিপ বর্মণের বাবা কিশোরী মোহন বর্মণ। ওই মামলাটির রায় হতে সময় লাগে ১৩ বছর।

দীলিপ বর্মণ বলেন, মামলাটি দেখতেন তাঁর বাবা কিশোরী মোহন বর্মণ। ১৩ বছর ধরে তিনি শুধু আইনজীবীকে টাকা দিয়ে এসেছেন। প্রতিবছর কমপক্ষে ১০টি করে মামলার শুনানির দিন ধার্য হয়েছিল। আদালতে গিয়ে কোন কোন দেখতাম বিচারক ছুটিতে আছেন। তখন আরও হতাশা বেড়ে যেত।

দীলিপ বর্মণ আরও বলেন, তবে নির্ধারিত দিনে হাজিরা দিতে আর্থিক ও সময় খরচ হত। এরপরও যখন মামলার অগ্রগতি পেতেম না। তখন মানসিক ভাবে আরও ভেঙে পড়তাম। অবশেষে রায়ে আমরা জিতেছি। তবে জমি এখনো অবমুক্তির আদেশ পাইনি।

এই প্রসঙ্গে আইনজীবী মো. মাছুম বিল্লাহ বলেন, বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা প্রায়শই মামলার প্রকারভেদের ওপরও নির্ভরশীল। দেওয়ানি মামলায় প্রায়শই জমি ও চুক্তি সংক্রান্ত বিবাদ থাকে। এই ধরনের মামলায় প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষ্যগ্রহণ ও আইনি জটিলতা বেশি। বর্তমানে খুলনার ২১টি আদালতে এমন দেওয়ানি মামলা রয়েছে ৫০ হাজারের বেশি। এখন বিচারকের সংখ্যা না বাড়ালে এই জট কখনো থামবে না।

আন্তর্জাতিক তুলনা

আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশ্ব বিচার সূচক World Justice Project (WJP) প্রতিবছর Rule of Law Index প্রকাশ করে, যেখানে বিভিন্ন দেশের বিচার ব্যবস্থার মান মূল্যায়ন করা হয়। World Justice Project, 2024 অনুযায়ী ডেনমার্ক রয়েছে ১ম স্থানে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৭তম (১৪২ দেশের মধ্যে)। ডেনমার্কে নাগরিক বিচার (civil justice) ও ফৌজদারি বিচার (criminal justice) দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও দ্রুততা সর্বোচ্চ মানে বজায় আছে।

আন্তর্জাতিক তুলনায় দেখা যায়, ডেনমার্কে প্রতি ১৫,০০০ জন নাগরিকের জন্য একজন বিচারক রয়েছেন এবং সেখানকার মামলার গড় নিষ্পত্তির সময় মাত্র ৬ মাস। তুলনায়, বাংলাদেশে একটি দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে ৫ বছর এবং একটি ফৌজদারি মামলা প্রায় ৭ বছর পর্যন্ত লেগে যায়। এই বৈষম্য দেখায়, বিচারকের ঘাটতি ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারে প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সমন্বয়কারী আইনজীবী মোমিনুল ইসলাম বলেন, বিচার বিভাগের সংকটের মূল কারণ হলো বিচারকের ঘাটতি ও মামলা নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রিতা। আমাদের দেশে একজন বিচারককে প্রতিদিন গড়ে ৫০টি মামলা শুনতে হয়, যা কার্যত অসম্ভব। এতে বিচারপ্রার্থীরা বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও রায় পান না। বিচারপ্রার্থীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মামলা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও ডিজিটালাইজেশনের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

মানদণ্ড ডেনমার্ক বাংলাদেশ
Judicial Independence সম্পূর্ণ স্বাধীন আংশিক স্বাধীন
Case Disposal Time ৬ মাস ৭–১০ বছর
Corruption Perception Index (2024) ১ম ১৪৯তম
Rule of Law Index ১ম ১২৭তম
Public Trust in Courts ৯০% ২৮%

বিচারক নিয়োগ প্রশিক্ষণ জরুরী

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের এই জট নিরসনে বিচারক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও প্রশাসনিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজনীয় পদ সংখ্যা পূরণ ছাড়াও, বিচারকদের প্রশিক্ষণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা আবশ্যক।

এই প্রসঙ্গে অন্তত ৫ জন অতিরিক্ত দায়রা জজের সাথে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তারা জানিয়েছেন, বিচারকদের পর্যাপ্ত নিয়োগের পাশাপাশি তাদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। প্রযুক্তি-নির্ভর বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণও প্রয়োজন।

বাংলাদেশ বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বিজেএটিআই) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিচারকদের প্রশিক্ষণ সুবিধা সীমিত এবং কোর্সগুলোর আধুনিকায়নও জরুরি হয়ে পড়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, বিচার বিভাগে জনবল বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে মামলার জট কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে নারী বিচারক নিয়োগ বাড়ানো হলে বিচারব্যবস্থা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে বলে তারা মনে করছে।

মানবাধিকার কর্মী আইনজীবী মোমিনুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে যে বিচারকরা যত বেশি প্রশিক্ষিত ও সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করে, মামলার নিষ্পত্তির সময় তত কমে। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক।

বিচারকের পাশাপাশি অবকাঠামোগত সংকট

নিম্ন আদালতের অবকাঠামোও যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অধিকাংশ আদালতে পর্যাপ্ত কক্ষে মামলা পরিচালনার ব্যবস্থা নেই। আদালতের রেকর্ড, ফাইল সংরক্ষণ ও তথ্যপ্রবাহ এখনও আংশিকভাবে হাতে পরিচালিত। ডিজিটালাইজেশন এ ক্ষেত্রেও খুব কম প্রয়োগ হচ্ছে। বিচারিক তথ্যের ডিজিটালাইজেশন এবং অনলাইন কেস ট্র্যাকিং না থাকায় আদালতের কার্যক্রমে জটিলতা বেড়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মো. মাছুম বিল্লাহ বলেন, “যদি আমরা চাই দ্রুত এবং নিরপেক্ষ বিচার, তাই বিচারক বাড়ানোর পাশাপাশি আমাদের পূর্ণ ই-জুডিশিয়াল সিস্টেম প্রয়োজন। ভিডিও হিয়ারিং, অনলাইন মামলা নথি এবং স্বয়ংক্রিয় কেস ম্যানেজমেন্ট থাকলে এই সমস্যা অনেকটা কমানো সম্ভব।”

সংকট নিরসনে সংস্কার সুপারিশ বাস্তবায়ন দরকার

বিচার ব্যবস্থার দক্ষতা, স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার একটি পরামর্শমূলক সংস্থা বাংলাদেশে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন (Judicial Reform Commission) গঠন করেছিল। এই কমিশন বিচার বিভাগে বিদ্যমান নানা সমস্যা চিহ্নিত করে বেশ কিছু সংস্কারের সুপারিশ দিয়েছে।

তাদের মতে, প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশেষ করে ই-জুডিশিয়াল সিস্টেম, অনলাইন কেস ট্র্যাকিং ও ভিডিও হিয়ারিংয়ের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি দ্রুত ও স্বচ্ছ করা সম্ভব। তবে যদি বিচারক সংখ্যা ও অবকাঠামোর ঘাটতি পূরণ না করা হয়, তবে ন্যায়বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই ন্যায়বিচার বঞ্চিত হওয়া—এটি দেশের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াবে।

বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশন, বিচারাধীন মামলার জট সহনীয় পর্যায়ে আনার জন্য নিম্ন আদালতের বিচারকের সংখ্যা কমপক্ষে ৬,০০০-এ উন্নীত করার পরামর্শ দিয়েছে। এর জন্য আরও প্রায় ৪,০০০ জন অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগ করা প্রয়োজন।

কমিশন যেসব জেলায় কমপক্ষে ১,০০০ আপিল বা পুনর্বিবেচনা মামলা বিচারাধীন, সেখানে দুই থেকে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক সৎ, দক্ষ এবং সুস্থ অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের নিয়োগের প্রস্তাবও করেছে।

“ধাপে ধাপে বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো উচিত। বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল এবং লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করতে হবে,” কমিশন গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তরিত তার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করেছে।

এই নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞ বাবুল হাওলাদার বলেন, যদি আমরা আজই সংস্কার শুরু করি, ৫–১০ বছরের মধ্যে নিম্ন আদালতের বোঝা হ্রাস করা সম্ভব। প্রতিটি নাগরিক যাতে সময়মতো ন্যায়বিচার পায়, সেজন্য এটি এখনই প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগের ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিচারক সংখ্যা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধিই সমাধান।

এই প্রসঙ্গে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘বিচারক সংকট আছে, লজিস্টিক সমস্যাও আছে। তবে নিয়োগ দিতে সময় লাগে। আমরা সরকারে থাকতে থাকতে সমস্যাটা মোকাবিলা করে যাবো।’

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top